প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ১০:১৮ এএম
1706
০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৮ পিএম
দেশের সর্বস্তরের বাসাবাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত এবং মাঝারি ও ভারী শিল্পকারখানায় আকস্মিক বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা, শর্টসার্কিট ও বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মর্মান্তিক প্রাণহানি রোধে প্রতিটি ভবনে ‘রেসিডিউয়াল কারেন্ট ডিভাইস’ (আরসিডি) বা ‘সেফটি সুইচ’ স্থাপন এবং এটি নিয়মিত পরীক্ষা করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়া-প্রবাসী আন্তর্জাতিক বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মো. শামছুল হুদা সরকার (রাজু)।
আজ বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক জনসচেতনতামূলক সংবাদ সম্মেলনে দেশের নাগরিক ও সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি এই বিশেষ কারিগরি আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে দীর্ঘ বিদ্যুৎ প্রকৌশল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শামছুল হুদা সরকার বলেন, ‘বিদ্যুতের নানামুখী ঝুঁকি ও লিকেজ অনেক সময় সাধারণ মানুষের খালি চোখে দেখা যায় না। ঘরের ত্রুটিপূর্ণ বা প্লাস্টিক গলে যাওয়া ছেঁড়া তার, ভেজা হাতে বা পানির সংস্পর্শে থেকে অসাবধানতাবশত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা এবং না বুঝে দেয়ালের ভেতরে থাকা লাইভ তারের ওপর ড্রিল মেশিন চালানো বা পেরেক লাগানোর মতো অসচেতন অভ্যাসের কারণে যেকোনো মুহূর্তে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সাধারণ সার্কিট ব্রেকার বা এমসিবি মূলত বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট কিংবা অতিরিক্ত ওভারলোড থেকে বাড়ির আসবাবপত্র ও দামি যন্ত্রপাতির সুরক্ষা দিলেও তা মানুষের অমূল্য জীবন রক্ষায় কোনোভাবেই কার্যকর নয়। ঠিক এই জায়গাতেই আরসিডি বা সেফটি সুইচ এক অনন্য ও জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। ঘরের কোনো লাইনে বা যন্ত্রে সামান্যতম লিকেজ কারেন্ট বা ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ যদি মানুষের শরীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে, তবে এই আরসিডি ডিভাইসটি মানুষের হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আগেই মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে পুরো ভবনের মূল বিদ্যুৎ সংযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, যার ফলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণহানির ঝুঁকি বা সম্ভাবনা একদম শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।’
অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ ২৬ বছরের কর্মজীবনের পেশাগত অভিজ্ঞতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এই বিশেষ সেফটি সুইচ ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক বা আবাসিক বৈদ্যুতিক স্থাপনাকেই বৈধ বা নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশেও এখন এই বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নতুন-পুরনো সব ভবনে বাধ্যতামূলক আইনগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। নিজের এক চরম পারিবারিক ট্র্যাজেডির কথা স্মরণ করে তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার এক অতি নিকটাত্মীয় একটি পোশাক তৈরি কারখানায় অসাবধানতাবশত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অকালে মারা যান। কারখানায় যদি যথাযথ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং এই সাধারণ সেফটি সুইচটি ইনস্টল করা থাকত, তবে এই নির্মম দুর্ঘটনাটি খুব সহজেই এড়ানো সম্ভব হতো।’
সংবাদ সম্মেলন থেকে সাধারণ জনগণের সুরক্ষায় তিনি কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক পরামর্শ প্রদান করেন। পরামর্শগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো
১. প্রতিটি ঘরের মেইন ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ডে (এসডিবি) অতি দ্রুত একটি মানসম্মত আরসিডি সুইচ স্থাপন নিশ্চিত করা।
২. প্রতি মাসে অন্তত একবার আরসিডির গায়ে থাকা ‘টেস্ট’ (টি) বাটনটি চেপে এর যান্ত্রিক কার্যকারিতা নিজে নিজেই পরীক্ষা করা।
৩. যেকোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি যেমন ইস্ত্রি, ওভেন, ওয়াশিং মেশিন ব্যবহারের আগে এর প্লাগ ও তারের বাহ্যিক অবস্থা ভালোভাবে যাচাই করা।
৪. ঘরের সব ধরনের নতুন ও পুরনো বৈদ্যুতিক কাজের জন্য স্থানীয় আনাড়ি লোক পরিহার করে বাধ্যতামূলকভাবে দক্ষ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত অনুমোদিত ইলেকট্রিশিয়ানের পেশাদার সহায়তা নেওয়া।
জনস্বার্থে সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতিও তিনি পাঁচটি জরুরি দাবি ও আহ্বান জানান। এগুলো হলো— জাতীয় পর্যায়ে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা বিধিমালা (কোড) প্রণয়ন করা, দেশের যেকোনো নতুন বা নির্মাণাধীন ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে আরসিডি সুইচ স্থাপন আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করা, সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরাতন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় নিয়মিত কঠোর ‘ইলেক্ট্রিক্যাল সেফটি অডিট’ পরিচালনা করা, বাজার থেকে নিম্নমানের ও জাল লাইসেন্সবিহীন বৈদ্যুতিক পণ্য বাজেয়াপ্ত করতে মোবাইল কোর্টের অভিযান জোরদার করা এবং দেশের যুবসমাজের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ইলেকট্রনিক্স জনসচেতনতা কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা।
তিনি অত্যন্ত আকুলভাবে বলেন, ‘একটি সাধারণ সেফটি সুইচ একটি পুরো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। আমাদের সামান্য অসতর্কতা বা সামান্য কিছু টাকা বাঁচানোর লোভ যেন কোনো সুখী পরিবারের আজীবনের কান্নার কারণ না হয়। নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবহারে দেশের প্রতিটি নাগরিককে এখনই সচেতন হতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে দেশের চলমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রশংসা করে শামছুল হুদা সরকার বলেন, বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের কল্যাণে যে নানামুখী আধুনিক উন্নয়নের ধারা ও সুশাসন শুরু করেছেন, তাঁর এই প্রগতিশীল নতুন উন্নয়নের দূরদর্শী ধারণাগুলোকে আমি অন্তরের অন্তস্তল থেকে সাধুবাদ জানাই। আমার দৃঢ়ভাবে মনে হচ্ছে, তিনি তাঁর জীবনের বিগত দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে দেশ ও জাতির ভাগ্য পরিবর্তনে অক্ষরে অক্ষরে কাজে লাগাচ্ছেন। তিনি যখন দীর্ঘদিন যুক্ত রাজ্যে রাজনৈতিক প্রবাসে বসবাস করেছেন, সেই সময়ে উন্নত বিশ্বের উন্নত নগর ব্যবস্থাপনা ও ভবনের এই অত্যাধুনিক সেফটি সুইচের ব্যবহার ও এর কার্যকারিতা সম্বন্ধে হয়তোবা গভীরভাবে অবগত হয়েছেন এবং দেশের মানুষের সুরক্ষায় এটি চালুর তাগিদ রাখছেন।
আমাদের দেশের সম্মানিত সরকারপ্রধান এবং বিদ্যুৎ ও গৃহায়ন সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের প্রতি বিনীত আবেদন জানিয়ে এই প্রবাসী বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘জনজীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের সকল কনস্ট্রাকশন ও বিল্ডিং টেকনিশিয়ানদের প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্স প্রদান করা হোক। একই সাথে তাদের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন এবং ভবন নির্মাণ কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি ও জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী ‘বিল্ডিং কমিশন’ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এর মাধ্যমে দেশের নির্মাণ শিল্প ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব শৃঙ্খলা, পেশাগত মান এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।’